ব্লগবিজনেস টেকনোলজিডিজিটাল বিভাজন পেরোনোর উপায়: বাংলাদেশের গ্রামীণ SMEs-এর জন্য বাস্তব পদক্ষেপ

ডিজিটাল বিভাজন পেরোনোর উপায়: বাংলাদেশের গ্রামীণ SMEs-এর জন্য বাস্তব পদক্ষেপ

Rural SMEs and Digital Divide in Bangladesh

ডিজিটাল বিভাজন বাংলাদেশে শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়: এটি গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক নীরব ঘাতক, যখন ঢাকার টেক পার্কগুলো রাতের বেলায় নিয়ন বাতির মতো জ্বলজ্বল করে। শহরগুলোতে মোবাইলের সংখ্যা মানুষের চেয়ে বেশি, কিন্তু সেই ঝলমলে টাওয়ারগুলোর বাইরে লাখ লাখ ছোট ব্যবসা ডিজিটাল অন্ধকারে কাজ করছে, যাদের সম্ভাবনা ইন্টারনেট অ্যাক্সেসের মতো মৌলিক একটি বিষয়ের অভাবে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

হ্যাঁ, বাংলাদেশের সফটওয়্যার শিল্প উল্লেখযোগ্যভাবে পরিপক্কতা লাভ করেছে। এখানে প্রচুর নিবন্ধিত আইসিটি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা অভ্যন্তরীণ বাজারে কয়েকশো কোটি মার্কিন ডলারের চাহিদা তৈরি করে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি এখনও শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ, যখন দেশের অর্থনীতির আসল চালিকাশক্তি গ্রামীণ ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলো মৌলিক ডিজিটাল টুলসের অভাবে ধুঁকছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি আইটি/আইটিইএস ইউনিটের বাজারমূল্য শত শত মার্কিন ডলার, কিন্তু নির্ভরযোগ্য সংযোগ এবং উপযুক্ত টুলস ছাড়া গ্রামীণ ব্যবসাগুলো এই সুযোগের নাগাল পায় না।

বাংলাদেশের ডিজিটাল বিভাজনের কঠোর বাস্তবতা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর তথ্য অনুযায়ী, শহরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা গ্রামের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, এই ব্যবধান প্রতি বছর আরও বাড়ছে। এই সমস্যাটি কেবল প্রযুক্তির অভাবের কারণে নয়, বরং এর মূলে রয়েছে ইন্টারনেটের উচ্চ মূল্য, ডিজিটাল জ্ঞান না থাকা এবং প্রয়োজনীয় স্থানীয় কনটেন্টের স্বল্পতার মতো গভীর কিছু পদ্ধতিগত সমস্যা।

সংখ্যাগুলো এক দুঃখজনক চিত্র তুলে ধরে: স্মার্টফোন হাতে থাকার পরেও গ্রামীণ অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষের ডিজিটাল জ্ঞান নেই বললেই চলে। অনেক গ্রামীণ উদ্যোক্তা ডিভাইস ব্যবহার করলেও ফেসবুক বা ইউটিউবের বাইরে তাদের তেমন কোনো কাজ নেই। এই পরিস্থিতি একটি বিশাল অব্যবহৃত সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করে: Start a Software Business in Bangladesh (2023) বইটিতে যেমন বলা হয়েছে, যদি সংযোগের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে বাংলাদেশের লক্ষাধিক আইটি পেশাদার কয়েক কোটি গ্রামীণ ছোট ব্যবসার জন্য কার্যকর সমাধান তৈরি করতে পারতেন।

জাতীয় উন্নতির জন্য ডিজিটাল বিভাজন কেন গুরুত্বপূর্ণ

বেসিস (BASIS)-এর এক জরিপে দেখা গেছে যে, বেশিরভাগ আইটি প্রতিষ্ঠানই দেশের ভেতরের ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজ করে, কিন্তু গ্রামের বাজারগুলোতে তারা তেমন গুরুত্ব দেয় না। এতে একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে। সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল ব্যবধান আরও বেড়েছে, যার ফলে গ্রামের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন শহরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।

সামনের বছরগুলোতে সফটওয়্যার এজ এ সার্ভিস (SaaS) বাজারটি অসাধারণ প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেখানে এর বার্ষিক বৃদ্ধির হারও হবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রামীণ ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর কাছে পৌঁছাতে পারবে না। ফরচুন বিজনেস ইনসাইটস-এর মতে, ২০২৩ সালে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই SaaS অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করেছে: এই পরিসংখ্যান সম্ভবত শহুরে ব্যবসাগুলোর দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে।

ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে আনার কার্যকরী উপায়

সাশ্রয়ী সংযোগ: শুধু গতির প্রতিশ্রুতি নয়

শহুরে অবকাঠামো দিয়ে গ্রামের ডিজিটাল বৈষম্য দূর হবে না। বরং যেসব উপায় আসলে কাজে লাগে, তা হলো:

  • বিদ্যমান অবকাঠামোকে কাজে লাগানো: সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) গ্রামীণ ডিজিটাল অ্যাক্সেসের একটি মূল ভিত্তি। এই কেন্দ্রগুলো ইন্টারনেট, প্রশিক্ষণ এবং সাধারণ সেবা দেয়। কিন্তু গ্রামীণ ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর উচিত সেগুলোকে শুধু সরকারি চেকবক্স হিসেবে না দেখে সত্যিকারের ডিজিটাল লাইফলাইন হিসেবে ব্যবহার করা।
  • মোবাইল-ফার্স্ট পদ্ধতি: সারাদেশে কোটি কোটি মোবাইল সংযোগ আছে। তাই এমন প্রযুক্তি তৈরি করা জরুরি, যা কম ব্যান্ডউইথেও ভালোভাবে কাজ করে, যেখানে ভালো 4G গতি পাওয়াটা বাস্তবতার চেয়ে বেশি আকাঙ্ক্ষার বিষয়। Start a Software Business in Bangladesh শীর্ষক বইয়ে যেমনটা বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মোবাইলই এখনকার নতুন ডেস্কটপ।
  • স্থিতিশীল সেবায় বাজার দখল: যারা শুধু দ্রুত গতির প্রতিশ্রুতি না দিয়ে ছোট ব্যবসার জন্য নির্ভরযোগ্য ও বিশেষায়িত প্যাকেজ দিতে পারবে, তারা গ্রামীণ বাজারে বড় একটি অংশ নিজেদের করে নিতে পারবে। তাদের এই উদ্যোগ গ্রামীণ ব্যবসাগুলোর আস্থা অর্জনে সহায়তা করবে।

স্থানীয় উপযোগী সফটওয়্যার: যা শুধু কথার জন্য নয়, বরং বাস্তব প্রয়োজনের জন্য তৈরি

SaaS প্রযুক্তি গ্রামীণ ব্যবসার পরিচালনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে, তবে কেবল তখনই যখন এই সমাধানগুলো এখানকার বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাবে:

  • বড় খরচের বদলে সাবস্ক্রিপশন: ভারী ও জটিল সফটওয়্যারে একবারে বড় অগ্রিম বিনিয়োগের দিন শেষ। এটি এমন এক পরিবর্তন, যা ছোট ব্যবসার জন্য গেম চেঞ্জার হতে পারে, কারণ তাদের জন্য ক্যাশ ফ্লোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
  • খাপে খাপে সমাধান: গ্রামের ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য জটিল এবং বিশাল সফটওয়্যারের প্রয়োজন নেই, তাদের দরকার এমন সমাধান যা সহজ এবং তারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে যুক্ত করতে পারে। যেমন, প্রথমে মজুত পণ্যের হিসাব রাখার ব্যবস্থা, এরপর বেতন-ভাতার কাজ স্বয়ংক্রিয় করা।
  • ইন্টারনেট ছাড়াও কাজ: যেসব অঞ্চলে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট দুটোরই সমস্যা থাকে, সেখানে এমন সফটওয়্যার খুবই জরুরি, যা ব্যবহারকারীকে অফলাইনে কাজ করার সুবিধা দেয় এবং পরে সংযোগ পেলে ডেটা হালনাগাদ (সিঙ্ক) করে নিতে পারে।

ফরচুন বিজনেস ইনসাইটস-এর তথ্য অনুযায়ী, আগামী দিনগুলোতে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার (এসএমই) ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু ছোট ব্যবসাগুলোর বাজেট সীমিত, তাই তাদের পক্ষে প্রচলিত আইটি অবকাঠামোতে একবারে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করা প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণেই SaaS তাদের জন্য একটি দারুণ বিকল্প।

ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ: মানুষের তৈরি সেতু

শুধু ইংরেজি ইউটিউব টিউটোরিয়াল ধরিয়ে দিয়ে কম সাক্ষরতার ব্যবহারকারীদের জন্য ডিজিটাল সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব নয়। কার্যকর ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজন:

  • বাংলা ভাষার ওয়ার্কশপ: প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু অবশ্যই স্থানীয় ভাষায় হতে হবে এবং তাতে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ ব্যবহার করা উচিত।
  • সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা: প্রশিক্ষণের জন্য এমন একটি মডেল তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে এসএমএস-এর মাধ্যমে টিপস পাঠানো, রেডিওতে অনুষ্ঠান করা এবং একজনের থেকে আরেকজনের শেখার মতো পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
  • বাস্তবতার সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতা: প্রশিক্ষণকে অবশ্যই দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে হবে, শুধু বিমূর্ত ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।

বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর ওপর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, যখন গ্রামীণ উদ্যোক্তারা কোনো প্রযুক্তির সুস্পষ্ট সুবিধা দেখতে পায় এবং সেটি ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, তখন প্রযুক্তি ব্যবহারের হার ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। কারণ, কোনো প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং ব্যবহারের সহজলভ্যতা সরাসরি ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর প্রযুক্তি গ্রহণের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

এখনকার জরুরি প্রয়োজন: কেন গ্রামীণ ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর আর অপেক্ষা করার সময় নেই।

দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে গেলে, ডিজিটাল রূপান্তর শুধু ঢাকার উঁচু ভবনে থাকা স্টার্টআপগুলোর জন্য নয়। এটি বগুড়ার সেই নারী পোশাক বিক্রেতার জন্যও, যিনি একটি অনলাইন দোকান দিয়ে তার আয় অনেক বাড়াতে পারেন। এটি নেত্রকোনার সেই মুদি ব্যবসায়ীর জন্যও, যিনি হাতে লেখা হিসাবের খাতা মিলিয়ে দিনের অর্ধেকটা সময় পার করেন। এটি সেই লক্ষাধিক গ্রামীণ উদ্যোক্তার জন্য, যারা যদি সঠিক টুলসগুলো হাতে পায়, তাহলে তারা কেবল নিজেদের ভাগ্যই নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির গতিপথও পরিবর্তন করতে পারে।

এই ডিজিটাল ব্যবধান দূর করাকে কোনো দাতব্য কাজ হিসেবে দেখা উচিত নয়, এটি একটি কৌশলগত বিষয়। আসল প্রশ্ন হলো, গ্রামীণ ছোট ব্যবসাগুলো ডিজিটাল হতে পারবে কি না তা নয়, বরং প্রশ্ন হলো— আমরা কি তাদের এমন একটি সিস্টেম দেব যা তাদের ডিজিটাল হওয়ার পথকে সহজ করবে। ডিজিটাল বিভাজন নিজে থেকে বন্ধ হবে না: এর জন্য এমন সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ প্রয়োজন, যা গ্রামের বাস্তবতা বিবেচনা করে এবং বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে থাকা মেধাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে।

সরকার যখন ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এর সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি ঢাকার ঝলমলে নতুন টেক পার্কগুলো হবে না। এর আসল সাফল্য হবে, যখন রংপুরের একজন কৃষক তার ফোনে বাজারদর যাচাই করতে পারবেন, সিলেটের একজন দর্জি অনলাইনে অর্ডার নিতে পারবেন এবং খুলনার একজন ছোট উৎপাদক বিশ্বব্যাপী ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। এটাই সেই বাংলাদেশ, যা আমরা তৈরি করছি। এটাই সেই ডিজিটাল বিভাজন, যা আমাদের দূর করতে হবে। আর ততদিন পর্যন্ত, ডিজিটাল বিভাজন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং আমাদের সবচেয়ে জরুরি সুযোগ হয়ে থাকবে।

কমেন্ট করুন

Your email address will not be published. * দিয়ে দেখানো ফিল্ডসমূহ অবশ্যই পূরণ করতে হবে

Free Trial Form - Rupantor